ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে চীনের স্টার্টআপ খাতে। একসময় এ ধরনের সংস্থাগুলো বিদেশী ভেঞ্চার ক্যাপিটালের ওপর নির্ভরশীল থাকলেও স্থানীয় সরকারি তহবিলের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে এখন। বিদেশী বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় সরকারি সহায়তার ভিত্তিতে চীনে প্রযুক্তি খাতে জন্ম নিচ্ছে নতুন ইউনিকর্ন কোম্পানি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পরিবর্তন চীনের প্রযুক্তি উদ্ভাবনকে স্বনির্ভর করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতাকে আরো তীব্র করছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
প্রসঙ্গত, ইউনিকর্ন কোম্পানি হলো এমন স্টার্টআপ, যার বাজারমূল্য ১০০ কোটি ডলার বা তার বেশি। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত নয়।
আর্থিক ডাটা পরিষেবাদাতা সাংহাই ডিজেডএইচের তথ্য অনুসারে চলতি বছরের জানুয়ারি-আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে চীনা স্টার্টআপগুলোয় বিদেশী বিনিয়োগে ব্যাপক ধস নেমেছে। এ সময় বিদেশ থেকে সংগ্রহ হয়েছে ৬৬০ কোটি ডলার বা মোট তহবিলের ১০ শতাংশ। এটি ২০১৮ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ।
চীনে সম্প্রতি গঠিত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি জিপু এআই। সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এ সহযোগী সংস্থা এখন বাজারে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে রয়েছে বেইজিং ও সাংহাইয়ের স্থানীয় সরকার এবং আলিবাবা গ্রুপের মতো শীর্ষস্থানীয় চীনা তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানি। আংশিকভাবে সরকারি মালিকানাধীন চায়না ইন্টারন্যাশনাল ক্যাপিটাল করপোরেশন (সিআইসিসি) জিপু এআইর আইপিওর প্রধান ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করবে। পুরো প্রক্রিয়াটি স্থানীয় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে বেইজিংয়ের প্রতীকী অবস্থান তুলে ধরেছে।
গত জানুয়ারিতে রফতানি বিধিনিষেধের তালিকায় জিপুকে অন্তর্ভুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির চীনা সামরিক আধুনিকায়ন কর্মসূচিতে সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে কোম্পানিটির জন্য মার্কিন সরবরাহকারীদের কাছ থেকে উন্নত কম্পিউটার চিপ পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। এখন জিপু সফলভাবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোয় তা একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বৈশ্বিক নিরীক্ষা সংস্থা পিডব্লিউসির জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ নাওটাকা সোনোডার মতে, ‘স্থানীয় স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে নিজেদের উপস্থিতি শক্তিশালী করছে বেইজিং।’
মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিচবুকের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) চীন সরকারের সঙ্গে যুক্ত বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো প্রায় ১৬ শতাংশ তহবিল রাউন্ডে অংশগ্রহণ করেছে। এক দশক আগে এ ধরনের অংশগ্রহণ ৫ শতাংশের কম ছিল।
চীনা স্টার্টআপগুলো মূলত দুভাবে তহবিল সংগ্রহ করে। প্রথমত তারা বিদেশী ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি থেকে ডলার বা অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রায় বিনিয়োগ গ্রহণ করে। এছাড়া ইউয়ান মুদ্রায় স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করে।
সাংহাই ডিজেডএইচের তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি-আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে চীনা স্টার্টআপগুলোর সংগৃহীত তহবিলের বড় একটি অংশ ছিল স্থানীয় মুদ্রায়। ২০১০-এর দশকের শেষের দিকে স্টার্টআপ তহবিলে ডলারের হিস্যা ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ, যা পরবর্তী সময়ে কমেছে। ২০২১ সালে শীর্ষে পৌঁছার পর মোট তহবিলও হ্রাস পাচ্ছে। এর মূল কারণ ডলারভিত্তিক বিনিয়োগ কমে আসা।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে ২০২০ সালের দিকে উচ্চ প্রযুক্তি খাতে নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয় চীন, যা ছিল বিদেশী ভেঞ্চার ক্যাপিটালদের জন্য চীনে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা। পরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে চীনে মার্কিন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগের ওপর জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তখন কিছু বিনিয়োগকারী তাদের চীনা কার্যক্রম আলাদা করতে বাধ্য হয়। সব মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক প্রতিবন্ধকতার মুখে চীনা স্টার্টআপগুলো সরকার-সংযুক্ত তহবিলের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তহবিলের উৎসে এ পরিবর্তন এরই মধ্যে চীনের স্টার্টআপ খাতকে নতুন আকৃতি দিয়েছে। ফার্মাসিউটিক্যাল, সেমিকন্ডাক্টর, বেসিক ম্যাটেরিয়াল ও এআইসহ চীনে জাতীয় কৌশলের অধীনে অগ্রাধিকারপ্রাপ্তরা গত বছর অন্যান্য শিল্পের তুলনায় বেশি তহবিল পেয়েছে। এর আওতায় শিগগিরই জিপুর মতো আরো ইউনিকর্ন বা শত কোটি ডলারের কোম্পানি দেখা দিতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনা স্টার্টআপে বিদেশী মূলধনের সংকোচন এবং সরকারি তহবিলের ওপর বাড়তি নির্ভরতা ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে প্রযুক্তি খাতে চলমান প্রতিযোগিতার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে আর্থিকভাবে এখনো এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র। চীনের তুলনায় বেসরকারি এআই খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ১০ গুণ বেশি। তবুও অনেক সময় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে চীনকে এগিয়ে দেয় মার্কিন বিধিনিষেধ। আলোচিত এআই কোম্পানি ডিপসিক এর সফল উদাহরণ।
সম্প্রতি চীন সফরে গিয়েছিলেন সিলিকন ভ্যালির ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট বিল গারলি। যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে চীনের প্রযুক্তিগত আগ্রহের মাত্রা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি। এ রোবোটিকস ও এআই উদ্যোক্তা বলেন, ‘চীনে কখনো উদ্ভাবন থামে না।’
এক সময় পশ্চিমা বিনিয়োগকারী ও চীনা করপোরেটদের মধ্যে শক্তিশালী পারস্পরিক নির্ভরতা ছিল। উচ্চ রিটার্নের বিনিময়ে মূলধন ও দক্ষ কর্মী সরবরাহ করতেন মার্কিন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় চীনে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি থেকে নতুন জ্ঞান অর্জনসহ বিনিয়োগের সুফল পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে যাচ্ছে, যা এখন চিরস্থায়ী দুষ্টচক্রে রূপ নিচ্ছে বলে আশঙ্কা অনেকের।